সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান আট মাসের যুদ্ধ বন্ধের জন্য কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত রবিবার ইরানকে একটি নতুন শান্তি প্রস্তাবের খসড়া পেশ করা হয়েছিল। সাত দিনের সময়সীমাভিত্তিক এই প্রস্তাবে উভয় পক্ষের আস্থা অর্জনে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার রূপরেখা ছিল এবং কয়েকটি দেশকে জামিনদার রাখার কথা ছিল।

তবে জ্যেষ্ঠ একজন ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দোহা কোনো সুনির্দিষ্ট অফার দিয়েনি, কেবল অগ্রহণযোগ্য কিছু ধারণা উপস্থাপন করেছে। তেহরানের পারমাণবিক ইস্যুতে নমনীয়তা না দেখানোর নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গত বুধবার জানান, যুদ্ধ বন্ধে নিজেদের উপস্থাপিত সাত দিনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের উপায় খুঁজতে মধ্যস্থতাকারীদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বলেন, ইরান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে এখনও সুযোগ দিচ্ছে।

মূলত যুক্তরাষ্ট্র চায় আলোচনার শুরুতেই ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকুক। তবে তেহরানের দাবি, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ এবং তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো শর্তগুলো আগে পূরণ করতে হবে।

ভ্যান্সের গোপন চিঠি এবং ট্রাম্পের অস্বীকৃতি

চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তেহরানের কাছে একটি গোপন চিঠি পাঠিয়েছেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবর অনুযায়ী, ভ্যান্স ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মহসেন রেজাইয়ের কাছে এই চিঠি পাঠান। শান্তি আলোচনা নতুন করে শুরু করার প্রয়াসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ভ্যান্সের মাধ্যমে শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। ট্রাম্প জানান, তিনি কেবল ইরানে চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা পাঠানোর উদ্দেশ্যে যোগাযোগের অনুমোদন দিয়েছিলেন।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে আগুন ও ড্রোন জব্দ

আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, রাডার বন্ধ রেখে অনুমোদিত পথের বাইরে চলাচলের সময় মাইন বিস্ফোরণে তিনটি ট্যাঙ্কারে আগুন ধরেছে। একই সাথে হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা ড্রোন জব্দ করার দাবি করেছে আইআরজিসি। ড্রোনটির তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা দাবি করে, এটি ইরানের উপকূলীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহ করছিল।

যুদ্ধ অর্থনীতি ও জাতীয় ঐক্যের ডাক

টানা আট মাসের যুদ্ধে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন ইরানের সাধারণ মানুষ। গত সেপ্টেম্বরে খাদ্যপণ্যের দাম একলাফে ১২১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে বলে সমকাল জানিয়েছে। এই সংকটের মুহূর্তে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক সহনশীলতা ও টেকসই নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্বাহীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে জরুরি পণ্য সরবরাহ, কর্মসংস্থান, আবাসন এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপচয় রুখে শীতকালীন জ্বালানি সংকট সমাধানের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ৫ হাজার এজেন্সির গোপন জাল

রয়টার্সের একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মার্কিন অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাঁচ হাজারেরও বেশি সংস্থার এক বিশাল গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কেবল একটি সংস্থাই চীন, রাশিয়া ও জার্মানি থেকে কোটি কোটি ডলারের রকেট প্রোপেল্যান্ট, বিস্ফোরক, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম এবং ভারী ট্রাক আমদানি করেছে। গোপন এই সংস্থাগুলো মূলত ভুয়া কোম্পানি ও প্রতিনিধির মাধ্যমে তেল বিক্রির অর্থ ব্যবহার করে বিশ্ববাজার থেকে এসব সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করছে।