প্রথম আলোর একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলাফেরার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে কারও গায়ে বা পায়ে পা লেগে যাওয়ার পর অনেক মানুষ তাৎক্ষণিক হাত বুকে বা কপালে রেখে ‘সালাম’ বা ‘সেলাম’ বলে সম্মান প্রকাশ করেন; আবার কেউ কেউ স্পর্শিত শরীরের অংশটি হাতে নিয়ে চুম্বন করেন। লোকসমাজে এটিকে শিষ্টাচারের অংশ মনে করা হলেও, ইসলামে এই ধরনের শারীরিক ভঙ্গির কোনো বিধান রয়েছে কিনা তা আলোচনা করা হয়েছে।
ইসলামে বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামে বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ মুমিনের বৈশিষ্ট্য। মহানবী (সা.) বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মানের ওপর জোর দিয়েছেন এবং বলেছেন, যিনি ছোটদের স্নেহ করেন না এবং বড়দের অধিকার চেনেন না, তিনি আমাদের দলভুক্ত নন (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯১৯)। তাই কারও গায়ে পা লাগলে লজ্জিত হওয়া বা বিনয় প্রকাশ করা ইসলামি শিষ্টাচারের আলামত, কিন্তু এই সম্মান প্রদর্শনের রূপকী হবে তা জানা জরুরি।
সালামের প্রকৃত উদ্দেশ্য
‘সালাম’ (আসসালামু আলাইকুম) শুধু একটি শব্দ নয়, বরং এটি একটি পবিত্র দোয়া ও অভিবাদন যার অর্থ ‘আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’। দুজন মুসলিমের সাক্ষাতে বা বিদায়বেলায় এই অভিবাদন বিনিময়ের নির্দেশ আছে। কিন্তু কারও গায়ে পা লাগলে বা ভুল হয়ে গেলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ‘সালাম’ করা ধর্মীয় দৃষ্টিতে অপ্রাসঙ্গিক। ইবনে হাজার আসকালানি লিখেছেন, সালাম হলো সাক্ষাতের সময় সম্প্রীতি ও দোয়া বিনিময়ের হাদিসসম্মত মাধ্যম; এটিকে নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটের বাইরে ব্যবহার করা হাদিসের পরিপন্থী (ফাতহুল বারি, ১১/১৪)।
অনিচ্ছাকৃত ভুলের ইসলামি বিধান
কারও গায়ে পা লেগে যাওয়া সাধারণত একটি অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা। ইসলামে মানুষকে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য দায়বদ্ধ করে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা ভুলবশত যা করো, তাতে তোমাদের কোনো অপরাধ নেই’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৫)। যেহেতু গায়ে পা লাগার পেছনে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য থাকে না, তাই এটি ইসলামি দৃষ্টিতে কোনো পাপ নয় যার জন্য বিশেষ প্রায়শ্চিত্ত দরকার।
প্রচলিত প্রথার উৎস ও ধর্মীয় মাপকাঠি
পা লাগলে হাত দিয়ে ছুঁয়ে বুকে লাগানো বা চুম্বন করার প্রচলনের কোনো ভিত্তি কোরআন বা হাদিসে নেই। এটি মূলত উপমহাদেশীয় আঞ্চলিক ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সংস্কৃতির প্রভাব, যেখানে পা লাগানোকে অপবিত্র বা পাপ মনে করা হয়। ইসলামে মানুষের শরীর পবিত্র; পা লাগলে মানুষ অপবিত্র বা অসম্মানিত হয় না। ফকিহ আবু ইসহাক আশ-শাতিবি উল্লেখ করেছেন, সমাজ ও প্রথাগত আচরণ যদি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস বা হাদিসের পরিপন্থী হয় অথবা সাধারণ প্রথাকে মানুষ সওয়াব বা ধর্মের অংশ মনে করতে শুরু করে, তবে তা বর্জনীয় বেদাতে পরিণত হয় (আল-ইতিসাম, ১/৩৭)।
গায়ে পা লাগলে করণীয় কী
যেহেতু পা লাগলে অপর ব্যক্তি কষ্ট পেতে পারেন বা অসম্মানিত বোধ করতে পারেন, তাই সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল স্বীকার করে নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে স্থানীয় ভাষায় ক্ষমা চেয়ে নেওয়াটাই ইসলামি শিষ্টাচার—যেমন ‘আমি দুঃখিত’, ‘মাফ করবেন’ বা ‘খেয়াল করিনি, ক্ষমা করে দেবেন’। এর মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মানও বজায় থাকে এবং ইসলামি রীতির কোনো বরখেলাপ হয় না।






