টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দेउলী ইউনিয়নের বাবুপুর গ্রামে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে উৎসবের মাহौল বিরাজ করছিল। গ্রামের শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধলোক সবাই আনন্দে মেতে উঠেছিলেন। কারণ দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে—গ্রামবাসীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী চাঁদা সংগ্রহ করে স্থায়ী খেলার মাঠের জন্য জমি কিনেছেন।
গ্রামবাসীদের উদ্যোগ ও অর্থ সংগ্রহ
ইনডিপেনডেন্ট টিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাবুপুর গ্রামে সাতশতাধিক পরিবার বাস করে এবং জনসংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের বেশি। তাদের বড় অংশ শিশু, কিশোর ও তরুণ, কিন্তু গ্রামে কোনো খেলার মাঠ না থাকায় তারা খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। এর আগে মাঠের জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সফলতা আসেনি।
কয়েক মাস আগে গ্রামের ক্রীড়ানুরাগী খোরশেদ আলমের সাথে এসএম ইকবাল মাহমুদ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। সবার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে জমি কেনার প্রস্তাব দেন। খোরশেদ আলম এতে উৎসাহ দেখান। পরে গ্রামের কয়েকজন বিত্তশালীর সাথে যোগাযোগ করলে তারা ইতিবাচক সাড়া দেন। গত ৮ সেপ্টেম্বর গ্রামবাসীদের অংশগ্রহণে আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে সবাই জমি কেনার পক্ষে মত দেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম জানান, ইকবাল মাহমুদ ও তার পাশাপাশি গ্রামের আজাহার শিকদার, সেলিম আল মামুন, মিজানুর রহমান, মজনু শিকদার, শফিকুল ইসলাম ও শুভ প্রামাণিক বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া গ্রামের অন্যান্য বাসিন্দা থেকে ২০০ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা সংগ্রহ করা হয়।
জমি কেনা ও হস্তান্তর
গ্রামের ইকবাল হোসেন সুজনের ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়। প্রতি শতাংশের দাম নির্ধারিত হয়েছিল ৫২ হাজার টাকা। জমির মালিক এক শতাংশের দাম মওকুফ করে দেন। বৃহস্পতিবার তিনি জমিটি গ্রামবাসীদের কাছে বুঝিয়ে দেন। এ সময় বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে জমি বুঝে নিতে যান গ্রামবাসী। দিনব্যাপী চলে আনন্দ-উৎসব। যুবকরা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেন অর্থদাতা ও প্রবীণ ব্যক্তিদের।
ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা এবং সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) জমি হস্তান্তরের পর জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মাঠ উদ্বোধন করা হয়। ইনডিপেনডেন্ট টিভির প্রতিবেদনে পতাকা উত্তোলনের কথা উল্লেখ নেই।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ও প্রতিক্রিয়া
খোরশেদ আলম জানান, আপাতত ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। পাশে আরও ৬০ শতাংশ জমি কেনার লক্ষ্য রক্ষা করছেন তারা। মোট ১২০ শতাংশ জমি পাওয়া গেলে একটি ভালো মানের খেলার মাঠ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
গ্রামের কিশোর হাবিবুল্লাহ সালমান বলেন, 'ধান কাটার পর আমরা ক্ষেতে গিয়ে খেলতাম। আবার ফসল বোনা হলে খেলা বন্ধ হত। এখন মাঠ হয়েছে। আমরা সারা বছর খেলতে পারব। তাই খুব ভালো লাগছে।'
গ্রামের প্রবীণ আব্দুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, 'একটি মাঠের জন্য আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। আজ আমাদের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তাই খুব আনন্দ লাগছে।'
বাবুপুর মসজিদ কমিটির সভাপতি নজরুল শিকদার মনে করেন, মাঠে খেলাধুলার সুযোগ তৈরি হলে কিশোর ও তরুণরা সুস্থ পরিবেশ পাবে এবং মাদক ও সন্ত্রাস থেকে দূরে থাকতে পারবে।
সরকারি মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা মন্তব্য করেন, 'সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহায়তা ছাড়াই গ্রামের মানুষ নিজেদের উদ্যোগে খেলার মাঠের জন্য জমি কিনেছেন। এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। তাদের উদ্যোগ দেখে অন্য গ্রামের মানুষও অনুপ্রাণিত হতে পারেন।'






