বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার আগে রাজধানীর উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ ও এক তরুণী। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ওই তরুণীকে তাহসিফের বান্ধবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও ওই তরুণী উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে যান। তারা একটি মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছান। কিছুক্ষণ পর আরেকটি মোটরসাইকেলে সেখানে যান দ্বীপ। মোটরসাইকেল পার্ক করে প্রথমে তাহসিফ ও ওই তরুণী রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তারা লিফটের সামনে অপেক্ষা করছেন; এ সময় দ্বীপ ছিলেন না। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় দ্বীপ সেখানে পৌঁছালে তিনজন একসঙ্গে বারের লিফটে ওঠেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেন তারা। পরে তিনজন একসঙ্গে বেরিয়ে মোটরসাইকেলে করে রওনা হন। এরপর তাহসিফের বান্ধবীকে তার বাসায় নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তাহসিফ ও দ্বীপ যান টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায়।
তাহসিফের মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনে ওই রাতের প্রতিটি মুহূর্তের তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা। তিনি কার সঙ্গে কোথায় গিয়েছিলেন, কতক্ষণ অবস্থান করেছিলেন এবং সর্বশেষ কারা তার সঙ্গে ছিলেন, সেসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উত্তরার রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে অবস্থানের সময় তাদের মধ্যে কী ধরনের কথাবার্তা বা ঘটনা ঘটেছিল, তা তদন্তের অংশ কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালত এ আদেশ দেন। এর আগে বেলা সোয়া ২টার দিকে দ্বীপকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, নিহত কে এম তাহসিফ সাউরি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। তিনি রাজধানীর তুরাগ থানার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে দ্বীপ তাকে বাসা থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে যান। এরপর থেকে তাহসিফ নিখোঁজ ছিলেন। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ ভাসছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। মরদেহের সুরতহাল করার সময় নিহতের ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ঘটনার দিন তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দ্বীপ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ স্বীকার করেছেন, নিহত তাহসিফ তার সিনিয়র ও বড় ভাই ছিলেন। তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে কী ঘটেছিল, মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার পর তাদের মধ্যে কী হয়েছিল এবং কীভাবে তার মৃত্যু হলো, সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। চার দিনের রিমান্ডে এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রের তথ্যের মিল-অমিল
একই ঘটনায় বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের মধ্যে কিছু তথ্যের মিল থাকলেও কিছু তথ্যের মধ্যে মতভিন্ন রয়েছে। যেমন, উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের সেক্টর নম্বরের বিষয়ে দুটি সংবাদপত্রের বর্ণনায় ভিন্নতা দেখা যায়: চ্যানেল আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ওই রেস্টুরেন্টে যান তাহসিফ ও তরুণী; অন্যদিকে ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে প্রবেশ করেন তাহসিফ ও তরুণী—এই বর্ণনা দুটো একই। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে সেক্টর নম্বর উল্লেখ করা হয়নি। বার্তা২৪-এর প্রতিবেদনেও সেক্টর নম্বর উল্লেখ করা হয়নি।
সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে মৃত্যুর তারিখ ও সময়ের বর্ণনায়ও মিল রয়েছে: সবাই জানায় যে ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৭ অক্টোবর রাতে, এবং মৃত্যুর পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পুলিশ জানতে পারে মরদেহ ভাসছে—এই তারিখ ও সময়ের বর্ণনা সব সংবাদপত্রে একই। তবে সময়ের একটি বিষয়ে মতভিন্ন: চ্যানেল আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও তরুণী নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে প্রবেশ করেন; ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদনেও একই সময় ও স্থান উল্লেখ করা হয়েছে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে এই সময়ের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়নি।
রিমান্ডের তারিখের বিষয়েও মতভিন্ন: চ্যানেল আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করেন; ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদনেও একই তারিখ ও বিচারকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে রিমান্ডের তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। বার্তা২৪-এর প্রতিবেদনেও রিমান্ডের তারিখ উল্লেখ করা হয়নি।
এ ছাড়া, চ্যানেল আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে দ্বীপ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে নিহত তাহসিফ তার সিনিয়র ও বড় ভাই ছিলেন; ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদনেও একই কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে এই তথ্যটি উল্লেখ করা হয়নি। বার্তা২৪-এর প্রতিবেদনেও এই তথ্যটি উল্লেখ করা হয়নি।






