আজকের পত্রিকা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষক সংকট চরমে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের চলতি মাসের তথ্য দেখিয়েছে, অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, কিউরেটর ও প্রভাষক—এই পাঁচ শ্রেণির মোট ৬ হাজার ৫৫৫টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ৩ হাজার ৫০৩ জন। অর্থাৎ ৩ হাজার ৫২টি পদ শূন্য, যা মোটের প্রায় ৪৭ শতাংশ। গত বছরের জুলাইয়ে শূন্য পদ সংখ্যা ২ হাজার ৭২৫টি ছিল, সে হিসাবে এক বছরে পরিস্থিতি আরও অবনত হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ পদগুলোতে সংকট বেশি
শূন্যতার হার সবচেয়ে বেশি জ্যেষ্ঠ পদগুলোতে। অধ্যাপক পদে অনুমোদিত ৮৮৯টির মধ্যে ৫৮৫টি (৬৬ শতাংশ), সহযোগী অধ্যাপকের ১ হাজার ৬৮০টি পদের মধ্যে ৯২৮টি (৫৫ শতাংশ) এবং সহকারী অধ্যাপকের ২ হাজার ৫০৪টি পদের মধ্যে ১ হাজার ৩৫৪টি (৫৪ শতাংশ) শূন্য। অন্যদিকে প্রভাষকের ১ হাজার ৪২০টি পদের মধ্যে ১৭৯টি (১৩ শতাংশ) এবং কিউরেটরের ৬২টি পদের মধ্যে ৬টি (১০ শতাংশ) খালি রয়েছে।
নতুন কলেজগুলোতে অবস্থা ভয়াবহ
২০০৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ২৩টি নতুন মেডিকেল কলেজে শিক্ষক সংকট সবচেয়ে বেশি। মাগুরা মেডিকেল কলেজে অনুমোদিত ৮৮টি পদের মধ্যে ৫৮টি শূন্য (৬৬ শতাংশ)। গোপালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজেও ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি পদ খালি। হবিগঞ্জ, কুষ্টিয়া, নেত্রকোনা, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজে একো অধ্যাপক কর্মরত নেই। পুরোনো বড় কলেজগুলোরও অবস্থা ভালো নয়—ঢাকা মেডিকেলে ৪৮৬টি পদের মধ্যে ১৮২টি, চট্টগ্রাম মেডিকেলে ৪২৫টির মধ্যে ১৬৬টি এবং রাজশাহী মেডিকেলে ৩৭৮টির মধ্যে ১৫৫টি পদ শূন্য।
মৌলিক বিষয়ে শিক্ষকের অভাব
অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, ফার্মাকোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, প্যাথলজি সহ আটটি মৌলিক বিষয়ে ২ হাজার ৬৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১ হাজার ৫৬০ জন। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোস্তফা তৌফিক আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, নন-প্র্যাকটিসিং ভাতা দেওয়া সত্ত্বেও এই বিষয়গুলোতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য বিষয়ের চিকিৎসকদের প্রভাষক বানিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে, কিন্তু একাডেমিক মান রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
কারণ: রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বণ্টন ও প্রশাসনিক জটিলতা
চিকিৎসা শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কলেজগুলোর মধ্যে শিক্ষকের অসম বণ্টন, পদোন্নতির দীর্ঘসূত্রতা এবং সুপারনিউমারারি (অতিরিক্ত) পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি দেওয়ার কারণে নিয়মিত শূন্য পদ পূরণ হচ্ছে না। গত দুই বছরে প্রায় সাড়ে সাত হাজার চিকিৎসকের পদোন্নতির বড় অংশ সুপারনিউমারারি পদে দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক বিভাজন বাধা
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন আজকের পত্রিকাকে জানান, শিক্ষক সংকটের বড় কারণ অসম বণ্টন। পদোন্নতিপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক এখনো নতুন পদে দায়িত্ব নেননি—কেউ ইনসিটুতে, কেউ ওএসডি হিসেবে, আবার কেউ মেডিকেল কলেজের বাইরে কর্মরত। তাঁদের প্রয়োজনীয় কলেজে পদায়ন করা গেলে সংকট অনেকটাই কমবে। তিনি আরও জানান, মেডিকেল কলেজগুলো স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগের অধীন হলেও শিক্ষকদের পদোন্নতি ও প্রথম পদায়নের দায়িত্ব স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের হাতে থাকায় কলেজের চাহিদা অনুযায়ী পদায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞের মতামত
ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশনের (ডব্লিউএফএমই) সাবেক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রয়োজন নিরূপণ না করেই সরকার বিভিন্ন স্থানে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে। মান নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ দেখা যায়নি। কৌশলগত পরিকল্পনার ভিত্তিতে নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, অন্যথায় মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি হবে না।





