বাংলা ট্রিবিউন অনুসারে, আইজিপি আলী হোসেন ফকির ২৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ‘ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘প্রয়োজন হলে এবং সরকার অনুমোদন দিলে পুলিশ ক্রসফায়ার করবে’ বলে মন্তব্য করেন। এই বক্তব্যের পর মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা দেখা দেয়।
পুলিশের ব্যাখ্যা
পুলিশ সদর দফতর সন্ধ্যায় জানায় যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে এবং তা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি বা হত্যার উদ্দেশ্যে নয়। তারা আত্মরক্ষার অধিকার ও প্রচলিত আইনের কথা তুলে ধরে, ২০২৬ সালের প্রথম দশ মাসে পুলিশ ১৭৬টি হামলায় ৪ সদস্য নিহত ও ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করে।
অতীতের গুম‑বিচারবহির্ভূত হত্যার স্মৃতি
সোর্সে উল্লেখ আছে যে ২০০৪ সালে র্যাব গঠনের পর ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নামে বহু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০০৬ সালের প্রতিবেদনে ২০০৪ সালের জুন থেকে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত র্যাবের হাতে ৩৬৭ জন নিহত, যার মধ্যে ২৮৪টি ‘ক্রসফায়ার’ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালে টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের গুলিবর্ষণ, ২০২০ সালে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের হত্যা এবং নারায়ণগঞ্জের সাতটি হত্যাকাণ্ডও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারের আলোচনায় উঠে এসেছে।
গুম‑সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য
চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ১,৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১,৫৬৯টি গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে; এর মধ্যে ২৮৭টি ‘নিখোঁজ ও মৃত’ শ্রেণিতে পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাই‑আগস্টে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংগঠনের মন্তব্য
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আবু আহমেদ ফয়েজুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতে পিছপা হবে না’ এমন মন্তব্যে তিনি হতবাক ও উদ্বিগ্ন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো সরকারের অনুমোদন বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ করতে পারে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ উল্লেখ করেন, কঠোর বলপ্রয়োগের পাশাপাশি অপরাধীদের আশ্রয়দাতা ও রাজনৈতিক সংযোগকারীদের শনাক্ত করা দরকার। তিনি অতীতের গুম‑বিচারবহির্ভূত হত্যার উদাহরণে উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক দুই মাসে মাদক‑সংক্রান্ত অভিযোগে পুলিশ সদস্যদের বরখাস্তের ঘটনা ঘটেছে।
সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সরকার অনুমোদন দিলে ক্রসফায়ার বিষয়টি পুলিশ বিবেচনা করতে পারে’ তবে আইনগত ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এমন মন্তব্য সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি অতীতের ক্রসফায়ার অভিজ্ঞতা ও বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলছেন, বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে কঠোর আইন প্রয়োগই সমাধান।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, ‘ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে আনা অপরিণামদর্শী ও বিপজ্জনক’। তিনি আইজিপির মন্তব্য প্রত্যাহার, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন।
আইন মন্ত্রী ১৪ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিলেন, সন্ত্রাস দমনে সরকার ক্রসফায়ারের পথে যাবে না; টিআইবি এই ঘোষণার সঙ্গে আইজিপির মন্তব্যের অসংগতির ব্যাখ্যা চেয়েছে।





