চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে ১০ নটিক্যাল মাইল ভেতরে, মৎস্য বন্দরের ইছানগর এলাকায় ১০ দশমিক ৩৩ একর জমিতে অবস্থিত মেরিন ফিশারিজ একাডেমি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। আজকের পত্রিকার সাক্ষাৎকারে একাডেমির অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ফাইজ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছরে এই প্রতিষ্ঠান সমুদ্রবিজ্ঞান, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং ও নটিক্যাল সায়েন্সে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিয়ে সামুদ্রিক খাতে বিশ্বস্ত ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বঙ্গোপসাগর ও সুনীল অর্থনীতিতে অবদান

অধ্যক্ষ মতে, একাডেমি বঙ্গোপসাগরের গঠন ও গতিপ্রকৃতি, মৎস্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও চাষ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় জীবনমান সম্পর্কিত নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান রেখেছে। এই জ্ঞান বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ ও সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এখান থেকে উত্তীর্ণ ক্যাডেটরা দেশীয় ফিশিং ভেসেল ও মার্চেন্ট শিপের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌবহরেও সুনামের সঙ্গে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন।

মাস্টার প্ল্যান অনুমোদন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বিশ্বমানের মেরিটাইম প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার লক্ষ্যে স্থাপত্য অধিদপ্তর বিদ্যমান ১০.৩৩ একর জমির ওপর একটি যুগোপযোগী মাস্টার প্ল্যানের নকশা প্রণয়ন করেছে। নকশাটি ইতিমধ্যে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত হয়েছে। মাস্টার প্ল্যান টিওঅ্যান্ডই-ভুক্তকরণ ও প্রকল্প গ্রহণের জন্য ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে বলে অধ্যক্ষ জানিয়েছেন।

ঐতিহাসিক পটভূমি ও শিক্ষা কার্যক্রম

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বঙ্গোপসাগরের চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাহাজ ও মাইন অপসারণ করে বন্দরকে ব্যবহার উপযোগী করার লক্ষ্যে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার রুশ বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিয়েছিল। বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার, সমুদ্রবিজ্ঞান চর্চা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ১৯৭৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর মেরিন ফিশারিজ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রাথমিকভাবে এটি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। ১ জুলাই ১৯৯৩ থেকে একাডেমিটি রাজস্ব বাজেটভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

একাডেমি প্রি-সি ট্রেনিংসহ স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এছাড়া সমুদ্রে মৌলিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য আবশ্যকীয় বিষয়ে নৌ-কর্মকর্তা (মেরিন) ও নাবিকদের এনসিলিয়ারি ট্রেনিং দেওয়া হয়। মৎস্য আহরণকারী জাহাজ, ট্রলার ও সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজে নিয়োজিত অফিসারদের সার্টিফিকেট অব কম্পিট্যান্সি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য রিফ্রেশার্স কোর্সও রয়েছে। চার বছর মেয়াদি বিএসসি (অনার্স) কোর্সের ব্যবস্থাও আছে।

প্রশিক্ষণ সুবিধা ও ক্যাডেট পরিসংখ্যান

মৎস্য সম্পদ আহরণ, আধুনিক ট্রলার পরিচালনা, সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা এবং আধুনিক নেভিগেশন প্রযুক্তিতে ক্যাডেটদের দক্ষ করে তুলতে একাডেমিতে অত্যাধুনিক সিমুলেটর, ল্যাবরেটরি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ সুবিধা রয়েছে। কোর্স কারিকুলামে আইসিটি ও ডিজিটাইজেশন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একাডেমিতে ৪০ ওয়ার্কস্টেশনের আইসিটি ল্যাব, মেরিন ওয়ার্কশপ, ইলেকট্রিক্যাল ল্যাব, সিম্যানশিপ ল্যাব, লাইব্রেরি, সুইমিংপুল, সিমুলেটরভিত্তিক প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং ফায়ার ফাইটিং সিমুলেটর রয়েছে।

একাডেমি থেকে এ পর্যন্ত ৪৪তম ব্যাচের ৯৪ জন নারী ক্যাডেটসহ প্রায় ২ হাজার ৩৫৩ জন ক্যাডেট প্রি-সি ট্রেনিং সম্পন্ন করে সনদ পেয়েছেন। ২০১১ সালে ৩২তম ব্যাচ থেকে পুরুষ ক্যাডেটদের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো নারী ক্যাডেটদের ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়।

আর্থ-সামাজিক অবদান ও ভবিষ্যৎ আশা

দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কর্মসংস্থান ও বহুমুখী শিল্প খাতে অবদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে একাডেমি ভূমিকা রাখছে। ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতিতে অবদানের পাশাপাশি 'নতুন বাংলাদেশ' বিনির্মাণেও একাডেমি কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদী কর্তৃপক্ষ।