প্রথম আলো অনুসারে, জ্বালানি সংকটের সমাধান হিসেবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে সুন্দরবনের ভেতরের আকরাম পয়েন্ট ও নলিয়ান গ্রাম উল্লিখিত হয়েছে। উভয় স্থানই শিবসা ও পশুর নদের সংযোগস্থলে অবস্থিত এবং দুই কিলোমিটার দূরত্বে দক্ষিণ ও পূর্ব বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যের সীমানা রয়েছে, যেগুলো ইউনেসকোর বিশ্ব‑ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

সরকারি ঘোষণার বিবরণ

১৩ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ খুলনা হিরণ পয়েন্ট, মোংলা ও পায়রায় তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কথা জানিয়ে ছিলেন। ১৯ অক্টোবর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খুলনার কাছে ২০ মিটার ড্রাফটযুক্ত স্থানে টার্মিনাল নির্মাণের সম্ভাবনা উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে ১৪ আগস্ট প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ফেসবুক পোস্টে একই প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের মতে, প্রকল্পের আগে সম্ভাব্যতা ও পরিবেশগত সমীক্ষা করা হবে এবং ফলাফল অনুকূল হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞ ও বন বিভাগের উদ্বেগ

একজন অজ্ঞাত নামের বনবিশেষজ্ঞের মতে, যদি পাইপলাইন ওপেন কাট পদ্ধতিতে গড়ে তোলা হয় তবে মাটির শ্বাসমূল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গাছের ব্যাপক মৃত্যু ঘটতে পারে; শিকড়ের নিচে পাইপলাইন বসানো ব্যয়বহুল হওয়ায় সরকার তা না বেছে নিতে পারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ উল্লেখ করেন যে গ্যাসের দাহ্য গুণের কারণে দুর্ঘটনা ও তেল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা ম্যানগ্রোভের গাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি আরও বলেন, টার্মিনাল কার্যক্রমের ফলে জাহাজের চলাচল বৃদ্ধি পেলে শব্দ ও কম্পনের মাধ্যমে ইরাবতী ও গাঙেয় ডলফিনের বাসস্থান হুমকির মুখে পড়বে।

বন সংরক্ষকের প্রধান মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, টার্মিনাল নির্মাণ সম্পর্কে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি এবং তিনি অতিরিক্ত মন্তব্য করতে ইচ্ছুক নন।

বহিরাগত সংস্থার পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ

ইউনেসকো ২০১৪ সাল থেকে সুন্দরবনের পরিবেশগত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আসছে এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্যান্য শিল্প প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টারের রিপোর্টে আগামী ২০ বছরকে লক্ষ্য করে কৌশলগত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়েছে, তবে বাস্তবায়নের সময়সূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় পরিবর্তন হয়েছে।

প্রতিবাদ ও মানববন্ধন

সমকাল, ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা ও আজকের পত্রিকা অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর খুলনা প্রেস ক্লাবের সামনে পরিবেশ সংস্থা ও মানবাধিকার গোষ্ঠী 'মানববন্ধন' আয়োজন করে এলএনজি টার্মিনাল পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানায়। সমকাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে অংশগ্রহণকারীরা প্রকল্পের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি, পাশাপাশি স্থানীয় জীবনের ওপর প্রভাবের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এই মানববন্ধনে পরিবেশ গবেষক গৌরাঙ্গ নন্দী, জলবায়ু কর্মী রবিউল ইসলাম এবং অন্যান্য সক্রিয় সদস্য অংশগ্রহণ করেন। তারা জোর দিয়ে বলেন যে প্রকল্পের অনুমোদনের আগে সম্পূর্ণ পরিবেশগত মূল্যায়ন ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

সারসংক্ষেপ

সুন্দরবনে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাব সরকারী ঘোষণার পর বিশেষজ্ঞ, বন বিভাগ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পরিবেশ গোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংস্থা প্রকল্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথম আলো এই বিষয়ের সর্বশেষ তথ্য উপস্থাপন করছে।