ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি কমার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বছরের শুরুতে বড় ধাক্কা খেলেও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ইউরোপের পোশাক আমদানির বাজার। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ রফতানিতে পিছিয়ে থাকলেও চীন বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে। অন্যদিকে ভিয়েতনামও রফতানি বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) সংকলিত ইউরোস্ট্যাটের জানুয়ারি-আগস্ট ২০২৬ সময়ের তথ্য অনুযায়ী, ইইউর দেশগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৬০২৯ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আমদানির পরিমাণ কমেছে ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং প্রতি কেজি পোশাকের গড় দামও কমেছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এই আট মাসে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ১১৯৩ কোটি ইউরো, যা আগের বছরের একই সময়ের ১৩৫০ কোটি ইউরোর তুলনায় ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কম। অর্থাৎ আট মাসে বাংলাদেশি পোশাকের রফতানি আয় কমেছে ১৫৭ কোটি ইউরো।

বাজার ঘুরে দাঁড়ালেও পুরোপুরি কাটেনি সংকট: জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়। শুধু জানুয়ারিতেই আমদানি কমেছিল ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। তবে মে থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়; মে-আগস্ট সময়ে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বছরের প্রথম ভাগের বড় পতন সামাল দিয়ে আট মাস শেষে আমদানি কমার হার ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

গত বছর ইইউর পোশাক আমদানি ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৯০০০ কোটি ইউরোতে পৌঁছেছিল। একই সময়ে ইউরোপের অর্থনীতি বেড়েছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ওই বছর চীনের পোশাক রফতানিকারকেরা যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তি শুল্কের চাপের মধ্যে ইউরোপের বাজারে সরবরাহ বাড়ান। এতে ইইউতে চীনের পোশাক রফতানির পরিমাণ ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

২০২৬ সালের শুরুতে ইউরোপের অনেক খুচরা বিক্রেতার কাছে আগের বছরের পর্যাপ্ত মজুত ছিল। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তাদের ব্যয়ক্ষমতা কমে যায়। মূল্যস্ফীতি ও ক্রেতাদের আস্থার অবনতির কারণে বিক্রেতারা নতুন ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেন। বসন্তে ইউরোপের খুচরা বিক্রি তুলনামূলক ভালো থাকায় পরবর্তী সময়ে নতুন ক্রয়াদেশ কিছুটা বাড়ে। একই সঙ্গে শরৎ ও শীত মৌসুমের পোশাকের চাহিদা পূরণে জুন-আগস্ট সময়ে আমদানি বেড়েছে। বছরের শুরুতে পিছিয়ে যাওয়া কিছু চালানও পরবর্তী সময়ে পৌঁছেছে।

ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির পরিমাণ ও গড় দাম—দুটিই কমেছে: জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পোশাকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার কেজি, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম কমেছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ; আট মাসে এই দাম দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো।

বাংলাদেশের রফতানি আয়ের পতনের বড় অংশের পেছনে রয়েছে পোশাকের দাম কমে যাওয়া—রফতানির পরিমাণ কমলেও আয়ের ওপর দামের পতনের প্রভাব তুলনামূলক বেশি। ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশও কমেছে: গত বছরের একই সময়ে বাজারটির মোট আমদানি মূল্যের ২১ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল বাংলাদেশের দখলে; চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে তা কমে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে।

ইউরোপের পোশাক বাজারে প্রধান সরবরাহকারীদের মধ্যে চীন সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে: জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে দেশটি ইইউতে ১৯৭১ কোটি ইউরোর পোশাক রফতানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি। চীন একমাত্র প্রধান সরবরাহকারী, যার রফতানির মূল্য ও পরিমাণ—দুটিই বেড়েছে; ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে চীনের অংশ ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।

ভিয়েতনামের রফতানিও বেড়েছে: দেশটি ইইউতে ৩০০ কোটি ইউরোর পোশাক রফতানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি। দেশটির পোশাকের গড় দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। অন্যদিকে পাকিস্তানের পোশাক রফতানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়লেও গড় দাম কমেছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ; দেশটির প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ১০ দশমিক ৮৮ ইউরো, যা প্রধান সরবরাহকারীদের মধ্যে সর্বনিম্ন। তুরস্ক, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার ইইউতে পোশাক রফতানি প্রায় ১১ শতাংশ করে কমেছে।

ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের বসন্তকালীন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ইইউর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ১ দশমিক ১ শতাংশ; ২০২৭ সালে তা বেড়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি কমে ২ দশমিক ৪ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে এ পূর্বাভাসের অন্যতম শর্ত হলো জ্বালানির দাম স্থিতিশীল হওয়া; মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি, জাহাজ পরিবহন ও বিমা ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ইউরোপীয় কমিশনের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত চলতি বছর ইইউর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে দিতে পারে।

গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিএভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই দিন পোশাকের দোকানগুলোর গড় বিক্রি ১৪ শতাংশ কমে যায়। বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। বছরের শেষ ভাগে বড়দিনকেন্দ্রিক বিক্রি দুর্বল হলে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে ইউরোপের ক্রেতারা নতুন পোশাকের ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিতে পারেন। এতে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ইইউর নতুন জিএসপি বিধিমালা এবং ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পরিকল্পনাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এসব পরিবর্তনের ফলে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে ইউরোপের পোশাক আমদানির বাজারে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেলেও বাংলাদেশের রফতানি এখনও চাপের মধ্যে রয়েছে। চীনের বাজার দখল বাড়ানো, ভিয়েতনামের রফতানি বৃদ্ধি এবং পোশাকের গড় দাম কমে যাওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইউরোপের পোশাক বাজারে চাহিদা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেলেও বাংলাদেশের রফতানি এখনও চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে পোশাকের গড় বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়ায় রফতানি আয় বেশি কমেছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু রফতানির পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নজর দিলে হবে না, পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়ানো এবং তুলনামূলক বেশি দামের পোশাক উৎপাদনেও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, ইউরোপের বাজারে চীনের রফতানি বাড়ছে এবং ভিয়েতনামও ভালো করছে; ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং ইউরোপের ক্রেতাদের অনিশ্চয়তা আগামী দিনের রফতানিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক জোরদার, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, ২০২৭ সালে ইউরোপের বাণিজ্যনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন এবং ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। এ অবস্থায় বাজারের পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে পণ্যের মান, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং বাংলাদেশের প্রধান শক্তি হিসেবে থাকা উৎপাদন দক্ষতা ও সরবরাহ সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।